নিনা কুলাগিনা রহস্যময় ক্ষমতাধর নারী। শরীরে নয়, যার শক্তি কিংবা রহস্য ছিল মনে। কারণ তিনি মানসিক শক্তি দিয়ে সামনে রাখা ছোটখাটো বস্তুগুলো নাড়া...
অনেক বিজ্ঞানী অদ্ভুত এ ক্ষমতাকে বলেন বিশেষ বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় শক্তি। নিনার শরীরের ভেতর যা প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়। নিনাকে শুধু ওই শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতে হয়েছে। নিনা কুলাগিনা ছিলেন গৃহবধূ। একদিন হঠাৎ করেই খুব রেগে গেলেন। রাগে কাঁপতে গিয়ে দেখলেন তার সঙ্গে চারপাশের ছোট ছোট হাঁড়ি-পাতিলগুলোও কাঁপছে। রাগ যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল তখন উপরের তাক থেকে নিচে পড়ে গেল পানির গ্লাস। শুধু তাই নয়, ঘরের বাতি আর পাখা নিজে থেকেই চালু আর বন্ধ হতে লাগল। ভয় পেয়ে গেলেন। বোঝতে পারছিলেন না, কেন এমন হচ্ছে। তবে বেশ কয়েকদিন পর বোঝতে পারলেন, এক আশ্চর্য ক্ষমতা আছে তার। শুরু করলেন কঠোর যোগ ব্যায়াম। ধীরে ধীরে আয়ত্তে নিয়ে এলেন এই আশ্চর্য শক্তি।
আশ্চর্য শক্তির অধিকারী নিনার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ১৯৬০-এর দিকে তাকে নিয়ে শুরু হয় হই চই। তখন চলছিল রাশিয়া-আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধ। ওই সময়টিতে নিনার এই ক্ষমতার প্রদর্শনী নিয়ে তৈরি হয় নানা সাদাকালো ভিডিওচিত্র। বিজ্ঞানীরা নিনাকে নিয়ে শুরু করে গবেষণা। একবার প্রায় অর্ধশত বিজ্ঞানীর সামনে এই শক্তি প্রদর্শন করেন নিনা। তার পরীক্ষা নেন জীববিজ্ঞানী অ্যাডওয়ার্ড নাওমোভ। এ প্রসঙ্গে গবেষকদের নিনা বলেছিলেন, যে এ জন্য প্রথমে মাথা থেকে সব চিন্তা দূর করতে হয় তাকে। অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থেই চিন্তামুক্ত হতে হয়। এরপর যে বস্তুটি নাড়াবেন তার ওপর গভীর মনোযোগ দেন।
পুরো মনোযোগ ওই বস্তুর ওপর স্থির হলেই মেরুদণ্ডে তীক্ষè ব্যথা অনুভব করতে থাকেন। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। আর নড়তে থাকে সেই বস্তুটি। এভাবে কখনো ম্যাচের কাঠি সরিয়ে কিংবা টেবিল থেকে কোনো কিছু ফেলে দিয়ে সাধন করতেন। তার এই আশ্চর্য শক্তির বেশ কিছু ভিডিওচিত্র খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমা বিশ্বে। মস্কোয় আয়োজিত প্রথম আন্তর্জাতিক প্যারাসাইকোলোজি সম্মেলনে দেখানো হয় এসব ভিডিও। তবে মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে তাকে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। সেই সময়ের মনোবিজ্ঞানীদের অনেকেই সোভিয়েত প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে নিনার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। এমনই এক মার্কিন মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম এ ম্যাকগেরি ১৯৭০ সালে নিনার সঙ্গে দেখা করে এসে জানালেন, তার সামনেই নিনা টেবিলে রাখা আংটি ও বোতলের ঢাকনাসহ আরো কিছু বস্তু নেড়েছেন। রাশিয়ার বিজ্ঞানী ড. জেনেক রেজডাক লিখেছিলেন, ‘১৯৬৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আমি নিনার সঙ্গে দেখা করি। সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন নিনার স্বামী, সাংবাদিক ব্লাজেক ও মনোবিজ্ঞানী জেএস জেরেভ। রেজডাকের এই লেখা সাড়া ফেলে দিয়েছিল চারদিকে। এরপর আরো কিছু ভিডিওচিত্র ধারণ করা হয় নিনার ওপর। এমনই একটি ভিডিওতে দেখা গেছে বেশ কয়েকজন মনোবিজ্ঞানীর সামনে বসে নিনা হাতের ইশারায় দেখিয়েছেন তার অদ্ভুত এই শক্তি। তাকে নিয়ে পৃথিবীজুড়ে চলছিল আলোচনা আর সমালোচনা। অন্য দিকে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন নিনা। একবার ড. রেজডাকের সামনে অনেক শক্তিপরীক্ষা দেয়ার পর খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তার নাড়ির গতি কমে আসে।
ফ্যাকাসে হয়ে যায় চেহারা। হাত-পা নাড়াতেও যেন কষ্ট হচ্ছিল। চিকিৎসক জেরেভ পরীক্ষা করে বোঝতে পারছিলেন নিনার হƒদস্পন্দন অনিয়মিত ও ডায়াবেটিস বেড়েছে। ধীরে ধীরে হাত-পায়ে ব্যথা ও চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করেন নিনা। ধারণা করা হয়, শরীরের পুরো শক্তি কাজে লাগিয়ে এত বেশি প্রদর্শনী করার কারণেই তার এই অবস্থা। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে হার্ট অ্যাটাক হয় নিনার। ১৯৯০ সালে মারা যান অদ্ভুত শক্তির অধিকারী নিনা।
অনেকে অভিযোগ করেছেন, স্নায়ুযুদ্ধে এগিয়ে থাকার জন্য নিনার এসব ছোটখাটো ছলচাতুরিকে বড় করে প্রচার করেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেই সময়কার মস্কোর একটি সংবাদপত্র নিনাকে মেকি ও প্রতারক বলেছিল। নিনাবিরোধীদের মতে, তিনি শরীরে চুম্বক জাতীয় জিনিস লুকিয়ে রাখতেন আর তা দিয়ে বস্তুকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যেতেন। কিন্তু পেনসিল, আপেল, ডিম অথবা কাচের গ্লাসে কি করে গতি এনেছেন, সেই ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তারা।
COMMENTS