১৯৫৩ সালের ৩ মার্চ। করাচি বিমানবন্দর, পশ্চিম পাকিস্তান। আকাশে ওড়ার আগেই রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ল চলন্ত উড়োজাহাজ। সামনে নালায় গিয়ে পড়ে বিধ্বস...
১৯৫৩ সালের ৩ মার্চ। করাচি বিমানবন্দর, পশ্চিম পাকিস্তান। আকাশে ওড়ার আগেই রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ল চলন্ত উড়োজাহাজ। সামনে নালায় গিয়ে পড়ে বিধ্বস্ত হলো আকাশের অতিকায় দানব। স্পট ডেড ৫ কেবিন ক্রুসহ ৬ যাত্রী। মাসখানেক পার হওয়ার পর মে, ১৯৫৩। এবার কাণ্ড কলকাতা।একই মডেলের উড়োজাহাজ। তখনকার দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ছেড়ে গেল উড়োজাহাজটি। মিনিটখানেক ওড়ার পরই কলকাতার কৃষকদের হতভম্ব করে দিয়ে তাদের মাথার ওপর দিয়ে ভারত মহাসাগরে গিয়ে পড়ে বিধ্বস্ত হলো বিমানটি। পরে ৪৩ জন আরোহীর সবাই নিহত হয়। ষাটের দশকে বারবার দুর্ঘটনার কবলে পড়া দ্য হ্যাভিল্যান্ডের এই ব্যাপক আলোচিত উড়োজাহাজটির নাম ‘কমেট’। জেট প্লেনের যুগের সূচনাকারী বলতে গেলে এই উড়োজাহাজই। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে জেট ইঞ্জিনের উড়োজাহাজ হিসেবে প্রথমবার কমেট আকাশে ওড়ে ২৭ জুলাই ১৯৪৯ সালে। তখনকার জমানার সবচেয়ে দ্রুতগামী আমেরিকার ডগলাসের উড়োজাহাজগুলোর তুলনায় এর গতি ছিল অকল্পনীয়। এর সঙ্গে টেক্কা দেয়ার মতো কেউই সেদিন ছিল না। ইঞ্জিন জগতে বিপ্লব এনে উড়ল কমেট। ব্রিটেনে এর ডিজাইন করা হয়েছিল মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহারের জন্য। প্রথমে এর জানালাগুলো ছিল চতুর্ভুজ আকৃতির। এর দ্রুত গতি যাত্রীদের আকৃষ্ট করল দারুণভাবে। বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু করার প্রথম বছরেই অর্থাৎ ১৯৫১ সালেই ৩০ হাজার যাত্রী বহন করে কমেট। যাই হোক, কাহিনী শুরু হলো ১৯৫২ সালে। ইতালির রোমে ১৯৫২ সালের ২৬ অক্টোবর প্রথম দুর্ঘটনাটা ঘটল। তখন তেমন কোনো ভয়াবহ ক্ষতি না হলেও রোমে একই বিমানবন্দরে ১৯৫৪ সালে এই কমেট আরো দু’বার বিধ্বস্ত হলো। এর মধ্যে একবার ৩৫ জন মারা যায়। ১৯৫৪ সালেই বিভিন্ন দেশ থেকে কমেটের ছোট-বড় দুর্ঘটনার খবর আসতে লাগল। বারবার কমেটের বিধ্বস্ত হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে বেশ ক’টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো। দুর্ঘটনার পর ধ্বংসাবশেষ নিয়ে তদন্ত শুরু হলো। প্রতিটি দুর্ঘটনা ঘটা বিমানবন্দরে তদন্ত হলো।কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিবেদন পাওয়া গেল আর দেখা গেল ইঞ্জিনে কিছু ত্রুটি আছে। অন্যকিছু প্রতিবেদনে জানালার সমস্যাটা উঠে আসল। চারকোনা জানালা থাকাটাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। পরে যত কমেট বানানো হলো সবই রাউন্ড জানালা। এই ঘটনা থেকে অন্য কোম্পানিগুলোও শিক্ষা নিয়ে গোলাকার জানালা তৈরিতে মন দিল। এর পর রোমে যখন ১৯৫৪ সালে ৩৫ জন আরোহীসহ কমেটের দর্পচূর্ণ হলো তারপর তদন্তে দেখা গেল কমেটের পুরো দৈহিক গঠনেই বেশ কিছু সমস্যা আছে। আর একে একে বিভিন্ন এয়ারওয়েজ স্থগিত করতে থাকল কমেটেরফ্লাইট। অভিশপ্ত ভাবা হতে থাকল বিমানটি। সমস্যা সারানোর জন্য গ্যারেজে প্রবেশ করল কমেট। ১৯৫৪-এর পর কমেটের ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়া হলো। মেরামত শেষে ১৯৫৮ থেকে আবার আকাশে ফিরে এলো কমেট। ততদিনে অবশ্য কমেটের সঙ্গে টেক্কা দেয়ার মতো আরো কয়েকটি উড়োজাহাজ নেমেছে আকাশে। তার পরও এর জনপ্রিয়তায় তেমন ভাটা পড়ল না। এরপর অনেকদিন উড়ে বেড়ানোর পর ১৯৯৭ সালের মার্চের ১৪ তারিখ শেষবার আকাশে ওড়ে ক্লান্ত কমেট। ছোটখাটো কিছু দুর্ঘটনা ছাড়া খুব বড় আর কোনো সমস্যা হয়নি এরপর উড়োজাহাজটির। জেট ইঞ্জিনের প্রথম বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ এখন আর ছোটাছুটি করে না।কমেটের ইঞ্জিনের অনেক উন্নতি হয়েছে ১৯৪৯ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত। বিমান ভ্রমণে গতিময়তার পথে এর জেট ইঞ্জিনগুলোর অবদান অসামান্য। তবে এর দুর্ঘটনাগুলো অনেকের কাছেই রহস্যের ডানা ঝাপটা দেয়। নেটে একটু সার্চ দিলেই কমেট ক্র্যাশের ওপর অনেক ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। রহস্য অম্লান। আরথার বেটি নামের এক সাবেক বিমান কর্মকর্তা কমেট নিয়ে লিখেন তার বিখ্যাত উপন্যাস, কোন অব সাইলেন্স। এই নিয়ে ১৯৬০ সালে সিনেমাও নির্মিত হয়ে যায়! ২৭ জুলাইয়ের প্রথম কমেটের আকাশে ওড়ার বছর পূর্তি।এই ভূখণ্ডেই আমাদের পূর্বপুরুষরা হয়তো অবাক হয়ে দেখতেন তাদের ঘুড়িগুলোর অনেক ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া কেমন এক অতিকায় পাখিকে। কমেট। বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল নিয়ে যত দুর্ঘটনার কথা প্রচলিত প্রায়ই ঘটেছে সেই সময়ে যখন বিমানের জেট ইঞ্জিন নিয়ে, বডি স্ট্রাকচার নিয়ে বলতে গেলে প্রাথমিক কাজ হচ্ছিল। জেট ইঞ্জিনের আগের সময়টাতে বিমানগুলো দূরে যাত্রার জন্য ঠিক উপযুক্ত ছিল না। আর ডানা, বডি ইত্যাদি পারফেক্ট ছিল না। আর তখনই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। তখনো উড়োজাহাজ পারফেক্ট হয়ে ওঠেনি। তাই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলকে বিশেষ কোন জায়গা বলার কারণ নেই কেননা এমন দুর্ঘটনা পৃথিবীর অন্য যে কোনো জায়গায়ও ঘটেছে এবং একই জায়গায় হয়তো কয়েকবারও ঘটেছে। বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল মিথ ছাড়া কিছুই না। বারবার ঘটা দুর্ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করে বিমানের উন্নতি হয়েছে। আর আজকাল দুর্ঘটনার সংখ্যাও অনেক কমেছে। অবশ্য অনেক দুর্ঘটনার জন্যই বিমান ইঞ্জিন কিংবা বিমানের গঠন নয় বরং চালকরা দায়ী থাকেন।

COMMENTS