আপনার হয়তো বহু বছর ধরেই বিটি শস্য বা উদ্ভিদের কথা শুনে আসছেন। জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে এসব শস্য উৎপাদন করা হয়, যাতে নিজেরাই নিজেদের কীটনাশক ...
আপনার হয়তো বহু বছর ধরেই বিটি শস্য বা উদ্ভিদের কথা শুনে আসছেন।
জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে এসব শস্য উৎপাদন করা হয়, যাতে নিজেরাই নিজেদের কীটনাশক হিসেবে কাজ করতে পারে।
যেমন বিটি তুলা, ভুট্টা, আলু, সয়াবিন, বিটি বেগুন এসবের জিনের ভেতরে কীটনাশক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এসব ফসল প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। মূলত সারা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা পূরণ করতেই ফসলের জিনগত এই পরিবর্তন।
কিন্তু, সবকিছুতেই যেমন একটা ‘কিন্তু’ থাকে এখন কৃষির এই জিনগত বিজ্ঞানেও একটা ‘কিন্তু’ তৈরি হয়েছে। কৃষকরা দেখছেন, এসব বিটি শস্যের ক্ষতি করতে পারে এরকম পোকামাকড়ও তাদের চোখে ধরা পড়তে শুরু করেছে।
প্রকৃতি এজন্যেই বিখ্যাত। সময়ের সাথে সাথে এই পরিবর্তন যেনো খুবই স্বাভাবিক। প্রকৃতি আজ যেভাবে আচরণ করবে আগামীতেও যে সেটা ঠিক একইভাবে কাজ করবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এসব নিয়েই গবেষণা করছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। পরীক্ষাগারে তারা তৈরি করছেন নতুন ধরনের কীটনাশক। তারা চেষ্টা করছেন, প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে আরো একটু এগিয়ে থাকতে।
Image copyrightREUTERSImage captionজিনগত প্রযুক্তি ঘটিয়ে নতুন খাদ্য যা জিএম ফুড হিসেবে পরিচিত
ব্রিটেনে বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী দ্যা নেচারে এই গবেষণার কথা প্রকাশিত হয়েছে। এর অন্যতম একজন গবেষক প্রফেসর ডেভিড লু। তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন বিটি আসলে কী।
তিনি বলেন, বিটি হলো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। এটা মাটিতেই তৈরি হয় এবং প্রোটিন উৎপাদন করে। এই প্রোটিন পোকামাকড়কে হত্যা করে। এসব প্রোটিনকে বলা হয় বিটি টক্সিন। জৈব কীটনাশক হিসেবে ব্যাপক পরিমাণে এই বিটি টক্সিন ব্যবহার করা হয়।
এই বিটি শস্যকে দেখা হয় কৃষিবিজ্ঞানের অন্যতম একটি সাফল্য হিসেবে। জিনগত পরিবর্তন ঘটানোর মাধ্যমে এই শস্যের উৎপাদন পরে অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
এর কারণ একটাই- উদ্ভিদ বা ফসলের রোগ সৃষ্টিকারী বা ক্ষতিকর যেসব কীটপতঙ্গ আছে সেসব মোকাবেলা করতে বিটি টক্সিনের সাফল্য।
যুক্তরাষ্ট্রে যতো তুলা তৈরি হয় তার ৮০ ভাগই বিটি তুলা। প্রচুর ভুট্টাও উৎপাদন করা হয় এই বিটি টক্সিনকে কাজে লাগিয়ে।
কিভাবে কাজ করে এই টক্সিন? ফসলের জন্যে ক্ষতিকর পোকামাকড়কে কিভাবে ধ্বংস করে এই বিটি প্রোটিন?
বিজ্ঞানী লু বলছেন, নিজেকে রক্ষা করার জন্যে পোকামাকড়ের শরীরে যেসব কোষ আছে, তার বাইরে থাকে এক ধরনের প্রোটিন। ওই প্রোটিনের সাথে মিশে যায় বিটি টক্সিনের প্রোটিন এবং এই প্রোটিন ব্যবহার করার মাধ্যমে তারা পোকামাকড়ের শরীরের ভেতরে এমন এক প্রক্রিয়ার সূচনা করে যার ফলে তার কোষের মেমব্রেনের ভেতরে একটি গর্তের মতো সৃষ্টি হয় এবং একসময় ওই কোষের মৃত্যু ঘটে। অর্থাৎ বিটি প্রোটিন ওই কোষটিকে হত্যা করে।
কিন্তু বর্তমানে কিছু পোকামাকড়ের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে যেগুলো ওই বিটি টক্সিন প্রতিরোধী।
Image copyrightBBC World ServiceImage captionভুট্টার ফলন
বিজ্ঞানীরা বলছেন, দেখা যাচ্ছে, এরকম পোকামাকড়ের সংখ্যা খুব বেশি নয়। এগুলো হাতে গোনা, যারা বিটি টক্সিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে। গত কয়েক দশকে বিজ্ঞানীরা কৃষিজমিতে এই বিবর্তনের বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছেন।
“এসব গবেষণা থেকে যেটা বোঝা যাচ্ছে সেটা হলো – পুনরায় উৎপাদনের জন্যে যদি কোনো মলিকিউলার সিস্টেম থাকে, এবং কোনো একটাকে বেছে নিতে হয়, তাহলে সেই প্রক্রিয়ায় এমন একটা জিনিসেরই উৎপাদন ঘটবে প্রকৃতিতে যার টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।”
বিজ্ঞানী ডেভিড লু বলছেন, “বিবর্তনের ওপর গবেষণা করে বোঝার চেষ্টা করছি কিভাবে এটা ঘটে থাকে। অর্থাৎ বলতে পারেন বিবর্তনের অস্ত্র ব্যবহার করেই বিবর্তনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। আমরা চেষ্টা করছি নতুন ধরনের বিটি টক্সিন তৈরি করতে যা এই টক্সিনের দুর্বলতাকে কাটিয়ে কার্যকর কীটনাশক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে।”
“প্রকৃতির তুলনায় গবেষণাগারে এই বিবর্তন খুব দ্রুত ঘটানো সম্ভব। একশো গুণেরও বেশি দ্রুত গতিতে বিজ্ঞানীরা সেই কাজটা করতে পারেন,” বলেন তিনি।
COMMENTS